প্রতিটি মানবজনম যে শক্তি-সম্পদ সহ ধরায় অবতীর্ণ হয়,
তার মধ্যে স্থুলতমটি হলো তার শরীর
যার নিয়মিত ক্ষুধা-নিবৃত্তি শ্রেষ্ঠতম তৃপ্তির মূল লক্ষ্য ও শর্ত।
শরীরের চেয়ে সূক্ষতর ও বৃহত্তর শক্তির উৎস হলো মানুষের মস্তিষ্ক-সম্ভূত যুক্তি-বুদ্ধি, বা তার মন । মন সর্বপ্রকারের চিন্তা ও কল্পনাশক্তির কারক । মনের দ্বারা মানুষের তাবৎ বিদ্যালাভ । মনের লক্ষ্য হলো নিজের ও পরের উপর কর্তৃত্ব-অর্জন এবং তার দ্বারা পার্থিব সম্পদ ও সুখের আহরণ ও সম্ভোগ। মন মানুষের আমিত্ব বা অহমিকার ধারক ও বাহক । মানুষের মন আপন অর্জন-জনিত দম্ভের লালন করতে দক্ষ - যে কোনও প্রকার প্রতিযোগী পরিস্থিতিতে ।
মনের অপেক্ষা অধিকতর শক্তি ও সূক্ষতার ধারক মানুষের প্রাণ বা পরাণ অথবা হৃদয় । পরাণের বিশেষ সামর্থটি হলো তার অনুভব-দক্ষতা । বিদ্যা অপেক্ষা বহুগুণে সার্থক সত্যনির্ণয় সম্ভবপর অনুভবের দ্বারা । মানুষের বুদ্ধি যেখানে, সত্যের মত, মিথ্যার সাথে সাথ দিতে সমান পারগ, সেখানে মানুষের পরাণ বা হৃদয় কেবল সৎ ও সত্যের সাথে সাথ দেওয়ায়, বুদ্ধি অপেক্ষা প্রবঞ্চকতাহীন ও যে কোনও প্রকার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অধিক নির্ভরযোগ্য ।
তবে, হৃদয়বৃত্তির উপযোগিতার নিয়মিত প্রয়োগে মানুষ চিরকালই বহুল পরিমানে অপারগ, বুদ্ধিবৃত্তির বিপরীতমুখী কারকতার কারণে । মস্তিষ্ক-চর্চার উপায়টি যেখানে অর্জন-জনিত আমিত্বের বিকাশে, সেখানে হৃদয়-চর্চার উপায়টি নিহিত ভালবাসার কাঙালপনায় । যে যত বেশি ভালবাসায় কাঙাল বা সমর্পণ-প্রবণ, সে তত অধিক হৃদয়-সামর্থের অধিকারী ।
এই সত্যটি মূলতঃ সাধারণ মানুষের জ্ঞানের অগোচরেই থেকে যায় ব'লে তারা মূলতঃ বুদ্ধি-প্রসূত অহমিকার দ্বারাই আজীবন পরিচালিত হয়ে থাকে ।
অনুভব-বিজ্ঞানের কার্যকর প্রয়োগের জন্য, তাই, বিদ্যার সম্ভার - পৃথিবীর যাবতীয় পুস্তক-সামগ্রীর পরেও মানুষের প্রয়োজন পড়ে আধ্যাত্মবাদের শিক্ষার ।
এই কারণে সর্বকালে, সব মহামানব, বিদ্যাজনিত অহমিকার মায়া ত্যাগ করে, উত্তরোত্তর আরও বেশি হৃদয়ের কাঙালপনার পথটি সাগ্রহে গ্রহণ ক'রে, আমাদের সাথে বুদ্ধি অপেক্ষা মহত্তর অধ্যাসটির পরিচয় ঘটান ।
আর এই সেই কারণ, যার জন্য আমাদের রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব বলে সম্ভাষণ না করে আর কোনও উপায় থাকে না ।
.
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন