দিনটি তার চোখ খুলেছিল
একেবারে অন্য সব অনুগত দিনের মতো—
একটি দিন, যাকে এখনো জানানো হয়নি
যে সে স্মৃতিতে পরিণত হবে।
শহর তার চিরচেনা ভেলকিবাজি অনুশীলন করছিল—
সবজির ভাঁজে সূর্যালোকের টুকরো গুঁজে দিচ্ছে ফেরিওয়ালারা,
রিকশাগুলো ধুলোয় টেনে নিয়ে যাচ্ছে বৃত্তাকার ক্লান্তি,
আর একটি বাস—অর্ধেক প্রাণী, অর্ধেক অভ্যাস—
আচারসিদ্ধ ক্ষুধায় গিলে খাচ্ছে শরীরগুলোকে।
সে জানালার ধারে বসেছিল,
অদৃশ্য জিনিস গুনছিল—
বিদ্যুতের খুঁটি গলে যাচ্ছে চিন্তায়,
চিন্তা গলে যাচ্ছে সময়েরও পুরোনো কিছুর মধ্যে।
আর পুরুষটি দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকটি শ্বাস দূরে,
ঝুলন্ত রড আঁকড়ে—
যেন মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে দরকষাকষি করছে,
যেন পড়ে যাওয়া মানে শুধু পড়ে যাওয়া নয়।
তারা ছিল অপরিচিত—
দূরত্বের এক স্থির বিন্যাস—
যতক্ষণ না কোনো নামহীন কিছু
সেই সত্যটিকে সম্পাদনা করে দিল।
কোনো অনুমতি চাওয়া হয়নি।
তাদের চোখ ধাক্কা খেল—
আর বাস্তবতা, এক ক্ষণিকের জন্য,
নিজেকেই ভুল হিসেব করল।
সময় থেমে যায়নি—
সে একটু কাত হয়ে দাঁড়াল।
স্মৃতির নিচের কোথাও থেকে
কিছু একটা উঠে এল—
শুধু আকাঙ্ক্ষা নয়,
বরং এক স্বীকৃতি, যার উৎস হারিয়ে গেছে,
যেন দুটি প্রতিধ্বনি হঠাৎ বুঝতে পারে
তারা সবসময় একই অসমাপ্ত শব্দের অংশ ছিল।
বাস তার কাজ চালিয়ে গেল—
কিন্তু তারা সরে গেল গতি থেকে।
তাদের দৃষ্টি আটকে গেল—
না ক্ষুধায়,
না দ্বিধায়—
বরং যেন দুটি দরজা
হঠাৎ বুঝতে পারল
তারা একে অপরের দিকে খোলার জন্যই তৈরি।
একটি স্রোত বয়ে গেল—
পৃথিবীর চোখে অদৃশ্য,
যুক্তির কাছে অপাঠ্য,
কিন্তু শরীরের নীরব বুদ্ধিতে অনস্বীকার্য।
শেষ স্টপেজে পৌঁছে
বাস তার মানব-ভর্তি শ্বাস ছেড়ে দিল
সন্ধ্যার নরম অনিশ্চয়তার মধ্যে।
নারীটি প্রথমে নামল—
যেন মাধ্যাকর্ষণ তাকেই বেছে নিয়েছে।
পৃথিবী থামল—
চোখে পড়ার মতো নয়,
কিন্তু নিজের সচেতনতার নিচে কোথাও।
তারপর—
তার মাথার সামান্য এক মোচড়।
কোনো নির্দেশ নয়।
এমনকি কোনো আমন্ত্রণও নয়।
শুধু সম্ভাবনার এক ফাটল।
আর সে তাতে প্রবেশ করল।
তারা হাঁটল একটি রাস্তা ধরে
যা ধীরে ধীরে নিজের উদ্দেশ্য ভুলে যাচ্ছিল—
দোকানগুলো ক্লান্ত চোখের পাতার মতো ভাঁজ হচ্ছে,
কণ্ঠস্বর নিজেরই ভূতে পরিণত হচ্ছে,
আলো গলে যাচ্ছে এক অনির্ধারিত গোধূলিতে।
নীরবতা তাদের সঙ্গে হাঁটছিল—
শূন্য নয়,
বরং অতিরিক্ত পূর্ণ।
শব্দ ব্যবহার করা বিশ্বাসঘাতকতা হতো—
যেন স্বপ্নের ভেতরেই দাঁড়িয়ে
তার অনুবাদ করা।
তারা পৌঁছাল এক জায়গায়
যেখানে অর্থ পরিত্যক্ত হয়েছে দীর্ঘকাল—
প্রয়োজনের জন্য বানানো এক কাঠামো,
এখন শুধু প্রতিধ্বনির বাসস্থান।
ভেতরে, নীরবতা ঘন হয়ে উঠল
যতক্ষণ না তা প্রায় স্পর্শযোগ্য লাগে।
সে থামল।
সে এসে দাঁড়াল—
যেন সে সবসময়ই তার পেছনে ছিল।
তাদের চোখ আবার মিলল—
কিন্তু এবার বাতাসের ঘনত্ব বদলে গেছে,
চাপা, সংকুচিত—
যতক্ষণ না মহাবিশ্ব মনে হয়
শুধু তাদের মাঝের ক্ষুদ্র দূরত্বটুকুতেই সীমাবদ্ধ।
জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আছে
যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না—
সেগুলো শুধু ঘটে।
সে হাত বাড়াল—
না তাড়াহুড়ো করে,
না সন্দেহ নিয়ে—
বরং সেই শান্ত নিশ্চয়তা নিয়ে
যেন সে পুনরাভিনয় করছে
একটি স্মৃতি, যা এখনো ঘটেনি।
এরপর যা ঘটল
তা কোনো ক্রিয়া নয়,
বরং দূরত্বের বিলুপ্তি।
বাইরের পৃথিবী ভেঙে পড়ল—
নাম, ইতিহাস, পরিণতি—
সব মুছে গেল
বৃষ্টির ধীর হাতের লেখায় চক মুছে যাওয়ার মতো।
রইল শুধু অনুভূতি—
তাৎক্ষণিক, প্রবল, সীমাহীন—
যেন বজ্রের খুব কাছে দাঁড়িয়ে
আবিষ্কার করা যে ভয়ের সেখানে কোনো ভাষা নেই।
তার ভেতর থেকে একটি শব্দ বেরোল—
ঠিক আর্তনাদ নয়,
ঠিক মুক্তিও নয়—
বরং এমন কিছু, যা শরীর সৃষ্টি করে
যখন নিজের তীব্রতাকে ধরে রাখতে পারে না।
সময় ফেটে গেল।
মুহূর্তগুলো নিজের আকার ছাড়িয়ে প্রসারিত হল,
তারপর হঠাৎ সহিংসভাবে
আবার সেকেন্ডে গুটিয়ে গেল।
আর তারপর—
স্থিরতা,
পরিণামের মতো ঘন।
যখন তারা বাইরে এল,
রাত ইতিমধ্যেই সবকিছু দখল করে নিয়েছে—
যেন সে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিল
তাদের অন্য কোথাও থেকে ফেরার জন্য।
রাস্তাটি আবার সাধারণ দেখাল—
প্রায় বিরক্তিকরভাবে।
পুরুষটি নারীটিকে একটি ছোট কার্ড বাড়িয়ে দিল—
একটি ভঙ্গুর বস্তু,
যা ধরতে চায় সেই জিনিসকে
যাকে ধরা যায় না।
“আমরা কি আবার দেখা করব?”
সে তাকাল তার দিকে—
না উত্তর দিল,
না অস্বীকার করল—
শুধু সেই একই দুর্বোধ্য জ্ঞাত হাসি নিয়ে
যা শুরু করেছিল সবকিছুর ভাঙন।
একটি হাসি, যা ফিসফিস করে বলে:
কিছু মুহূর্ত পুনরাবৃত্তির জন্য তৈরি নয়—
শুধু ভুতুড়ে হয়ে থাকার জন্য।
সে মাথা নাড়ল।
অথবা হয়তো পৃথিবীই তা কল্পনা করল।
তারপর সে চলে গেল,
নিজেকে আবার গুটিয়ে নিল শহরের বিস্মৃতির ভাঁজে—
ভিড়ে, নামহীনতায়,
অচেনা হয়ে যাওয়ার নরম মুছে যাওয়ায়।
সে দাঁড়িয়ে রইল—
বাস্তবতার পাতলা প্রান্তটি ধরে।
কারণ কোথাও গভীরে,
ব্যাখ্যার নিচে,
নিশ্চয়তার নিচে,
সে বুঝেছিল—
বাসটি শুধু শরীর বহন করেনি।
সে ক্ষণিকের জন্য পথ হারিয়ে ঢুকে পড়েছিল
অস্তিত্বের এক সমান্তরাল করিডরে।
আর কয়েকটি অসম্ভব,
ফিরে না-আসা মুহূর্তের জন্য—
তারা দু’জনেই সেখানে বেঁচে ছিল।
একসাথে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন