রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬

কালবৈশাখী

আমি তার ছায়াও চিনতাম না,
তার কাঁধের মানচিত্রে কোনোদিন আঙুল রাখিনি—
তবু সে দৌড়ে এলো
যেন আমার বুকই একমাত্র তীর,
যেখানে বহু বছরের ডুবে থাকা থেকে
সে উঠে আসতে চায়।

তার শরীর ধাক্কা দিল আমার শরীরে—
নরম নয়,
বরং শুকনো কাঠে আগুন লাগার মতো
হঠাৎ, উগ্র, অস্থির।
তার আঙুল পিঠে আঁকড়ে ধরল,
নখ কাপড় ভেদ করে
চামড়ার নিচে লুকোনো স্রোত ছুঁয়ে গেল।
তার নিঃশ্বাস—
আগেই ভারী, আগেই উত্তপ্ত—
আমার গলার কাছে এসে
নিজস্ব ঝড় তৈরি করল।

সে আরও কাছে এল—
কোমর সমান্তরাল,
উরু কাঁপছে এক অদৃশ্য দাবিতে,
হৃদস্পন্দন আর হৃদস্পন্দন
বন্ধ দরজায় মুষ্টাঘাতের মতো
একসাথে বাজতে লাগল।
তার কথাগুলো ছিল অমসৃণ—
শব্দ নয়, চূর্ণ অঙ্গার।

সে চেয়েছিল ভিতর থেকে কেঁপে উঠতে,
হাড়ের ভেতর দিয়ে এক বজ্রধারা বয়ে যাক,
পেশী ভেঙে যাক আত্মসমর্পণের ঢেউয়ে।
ঘর গলতে শুরু করল—
দেয়াল মোমের মতো নরম,
ছাদে ঝুলছে আলো-দাঁত।
ত্বক ছুঁয়ে ত্বক
দুটি মেঘ নিজেদের বজ্র জন্ম দিচ্ছে।

তার শরীরের ছন্দ
ধীর থেকে দ্রুত,
ফোঁটা থেকে প্লাবন।
তার কণ্ঠ ভাঙল—
ভাঙন নয়, মুক্তি।
বন্দী কোনো বুনো ডাক
অবশেষে আকাশ পেল।
আর সেই কম্পমান শিখার ভেতর
আমরা বুঝলাম—
দেহ কেবল দরজা,
তার ওপারে আরেক আকাশ।

তার কাঁধে মুখ রাখতেই
আমি শুনলাম রক্তে সমুদ্রের শব্দ।
সে আমার বুকে কান রেখে বলল—
এখানে ঝড় আছে।
আমাদের আঙুল
অপরিচিত অন্ধকারে পথ খুঁজল,
যেন গুহার ভিতর
প্রথম আগুন জ্বালাতে এসেছে মানুষ।

তার পিঠ বাঁকলো চাঁদের মতো,
উষ্ণতা ঢেউ তুলল—
একবার, দু’বার,
তারপর অগণিতবার।
বাতাসে ঘাম আর নিঃশ্বাস
এক নতুন আবহাওয়া তৈরি করল—
যেখানে সময় গলে যায়,
ঘড়ি নিজের কর্তৃত্ব হারায়।

শেষে আমরা
দু’টি উত্তপ্ত গ্রহ
একই কক্ষপথে স্থির হয়ে রইলাম।
ভোরের আগে
অন্ধকারের গায়ে নীল আলো উঠল।
তার আঙুল আমার বাহুতে
অবচেতন রেখা আঁকতে লাগল—
শরীর এক কাগজ,
রাত তার কবিতা লিখে গেছে।
ঘামের লবণ শুকিয়ে
ত্বকে রেখে গেছে সমুদ্রের স্মৃতি।

চাদর জড়ানো দেহ
দুই উষ্ণ দ্বীপ—
একই স্রোতে বাঁধা।
আমাদের মাঝখানে আর ঝড় নেই,
শুধু গভীর স্থিরতা—
যেন দীর্ঘ অশান্তির পর
নদী নিজের গভীরতা খুঁজে পেয়েছে।
বাইরে পাখিরা ডাকছে,
নতুন দিনের দরজা খুলছে—
কিন্তু আমাদের ভেতরে
রাতের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে,
উজ্জ্বল নয়,
তবু নেভেও না।

সেই রাতে
আমরা কেবল একে অপরকে ছুঁইনি—
আমরা আবিষ্কার করেছি
কীভাবে অপরিচিত দুই দেহ
এক মুহূর্তে
একটি মহাবিশ্ব হয়ে উঠতে পারে,
আর ভোরের আলোতেও
তার উষ্ণতা
ত্বকের স্মৃতিতে,
হৃদয়ের গভীরে,
নিঃশব্দ আগুন হয়ে
রয়ে যায়।

কোন মন্তব্য নেই: