_________________Arup Sarkar
.
সত্য - আংশিক ও পূর্ণতর, এই দুই রকমই হতে পারে ৷ যত নিকট হতে দেখা যায়, সত্যকে তত আংশিক হতে হয় ! দূরে গেলে সামগ্রিক রূপটি দৃশ্যমান হতে পারে ! এক্ষেত্রে পরিপ্রেক্ষিত একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে !
.
যেমন আমরা জন্ম হতে যে শহরে বা গ্রামে বাস করি, তার একটি চিত্র আমাদের মানসপটে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি থেকে আঁকা হয়ে যায় ! কিন্তু আমরা যেদিন প্রথম সুযোগে এরোপ্লেনে উঠে, অথবা নিদেনপক্ষে, ত্রিমাত্রিক গুগুল ম্যাপে আমাদের গ্রাম বা শহরটিকে অন্বেষণ করার সুযোগ পাই, তখন আমাদের দীর্ঘ-লালিত ধারণাটিকে অবাক করে দিয়ে, সত্যের সম্পূর্ণ অজানা একটি সামগ্রিকতর রূপ ও তার পৃথকতর সৌন্দর্য আমাদের কাছে দীপ্যমান ও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে ৷
.
স্থুল-মাত্রিক রূপ এবং সূক্ষ্ম-মাত্রিক রূপেও সত্যের অনুধাবন এভাবে পাল্টে যেতে হয় !
.
পৃথিবীতে যে কোনও সত্য, তা সে যে স্তরেরই হোক না কেন, প্রথমে ধরা দেয় - মানুষের অনুভবে ! সেই সত্যটিকে অপর কাউকে ব্যবহারযোগ্য করে পরিবেশন করার জন্য যে অনুবাদকটির উপস্থিতি আবশ্যিক হয়ে ওঠে সে হলো যুক্তি ! আবিষ্কারকটি সর্বদা অনুভবকেই হতে হয়, তবে আবিষ্কারকের কাজটি, নিজের ছাড়া, পৃথিবীর আর কারও কাজে লাগে না, যদি যুক্তি সত্যটির সহজবোধ্য অনুবাদটি করতে বিফল হয় !
.
তবে, মানুষ অহরহ যে ভুলটি করে, সেটি হলো - যুক্তি বা তথাকথিত যুক্তিবাদকে অনুভবের মাথায় বসিয়ে, তাকে কর্তৃত্বের অধিকারটি দিয়ে ফেলা !
.
যেমন, তর্ক ও আলোচনায় যে মূল প্রভেদটি থাকে, সেটি হলো - যে কোন তর্কে, অহঙ্কারের হীন স্বার্থপরতায়, প্রতিদ্বন্দীকে অশ্রদ্ধেয় প্রমাণ করে, নিজেকে একমাত্র সঠিক তথা সত্যের অনন্য প্রতিনিধি বলে দাবী করা ! অথচ আলোচনার মূল লক্ষ্যটি হলো, অন্যকে বলতে দেওয়ার মাধ্যমে, আপন অনুভবটি তার দৃষ্টিকোণে বসিয়ে, অতঃপর রোজের ঘর ঝাঁট দেওয়ার মত, আপন আপন দৃষ্টিকোণের এযাবৎ অদৃশ্য ত্রুটিগুলি প্রত্যক্ষ করতে পেরে, পরিহার করে, উভয়েরই গ্রহণযোগ্য করে সত্যটিকে পুনরায় বিশ্বস্ত স্মৃতিতে সুন্দরতর রূপে প্রতিস্থাপন করা ৷ তর্কে তাই যার পর নাই আগ্রহ যুক্তির, অথচ আলোচনায় আগ্রহ একমাত্র সুলোচন অনুভবের !
.
এই ব্যপারটিকে বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক ৷ বাড়িতে একটি অতি বিশ্বস্ত কাজের লোক আছে ! সে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সংসারের যাবতীয় রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিটি কাজ রোজ সংশয়হীন নিষ্ঠা সহকারে করে থাকে ৷ সে বাড়ির প্রতিটি লোককে যথেষ্ট শ্রদ্ধাও করে ৷
.
তার এইরূপ মহত্ব দিনের পর দিন, বছরের পর বছর দেখে, বাড়ির মালিক অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন - "অতঃপর, সংসারের কোথায় কোন খরচ - কতটা হবে, সেটা ঐ কর্মচারীই ঠিক করবে এবং তাকে লকারের চাবিটি দিয়ে রেখে, কোথায় সংসারে খরচের টাকা জমা থাকে দেখিয়ে দেওয়া হবে ৷"
.
এই অবিবেচকতার কারণে মালিকটির যে যে বিপদের সম্ভাবনা তৈরী হবে, সে হলো -
.
১) বাড়ির প্রতিটি মানুষের রুচি ও পছন্দ সঠিক অনুভবের জন্য যে পরিশীলিত বোধের সূক্ষতা মালিকের পক্ষে অনায়াস ছিল, কর্মচারীটির রুচিবোধ তার সমকক্ষ না হওয়ার কারণে, মালিকের ও বাড়ির অপর সকলের এযাবৎ নিয়মিত, তৃপ্ত-অভ্যাসে নতুন নতুন বিঘ্ন সৃষ্টি হতে শুরু করবে ! তদ্বারা শান্তির অতীত পরিবেশটি ক্রমশঃ নষ্ট হওয়ার ফলে নিত্য নূতন অশান্তি ও উষ্মার সম্ভাবনা তৈরী হতে থাকবে একই সংসারে ৷
.
২) প্রকৃতির অবশ্যিক তাড়নায় মানুষমাত্রে কিছু না কিছু অবদমিত ভোগবাসনা থাকতেই হয়, যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত হয়, যেমন কর্তব্যবোধ দ্বারা তেমনই পরিবেশ দ্বারা ৷ পরিবেশটি আচমকা নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে গেলে তার প্রভাব কর্তব্যবোধেও পরার সম্ভাবনা খুবই বেশি ! বিচক্ষণ মানুষরা এই কারণে আপন দৈনন্দিন পরিবেশের নির্দিষ্ট উচ্চতার স্তরটির যোগ্য সংরক্ষণ যথেষ্ট যত্নসহকারে করে থাকেন ! অপরপক্ষে এই ক্ষেত্রে, হঠাৎ পেয়ে যাওয়া অবাধ স্বাধীনতাটির দৌলতে অবদমিত বাসনাদের স্বেচ্ছাচারের ফনার মাথা তোলার সম্ভাবনাটি একটু একটু করে তৈরী হবে ৷
.
প্রথমবার কর্মচারীটি সিন্দুক হতে একটি পাঁচ টাকার কয়েন সরিয়ে হয়তো পানের দোকান থেকে একটি গুটখা কিনে খাবে ৷ কোন অসুবিধা হয়নি দেখে, অতঃপর, একদিন পঞ্চাশ টাকার নোট সরিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখবে ও ঘুঘনি খাবে ! এভাবে, ক্রমে ক্রমে, বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তার নিজের ঘরে ঢুকে রোজ বাংলা মদ খাওয়ার অভ্যাস হবে ! এরপরে! হয় - তার কোন প্রেমিকা জুটবে - নিয়মিত টাকা আত্মস্মাৎ করার লোভে অথবা সে নিয়মিত হারে বারনারীতে আসক্ত হবে ৷ একদিন মালিকটি তার অতিবিশ্বস্ত কর্মচারীটিকে অনিচ্ছুক নারীকে উত্যক্ত করার কারণে পুলিশের জিম্মায়, অথবা মদ খেয়ে বেহূঁশ হয়ে ড্রেণের ধারে পড়ে আছে দেখে, কাজ থেকে চিরতরে ছাড়িয়ে দেবে ৷
.
এই উদাহরণটিতে মূল প্রতিপাদ্য যা, সে হলো, পৃথিবীতে যোগ্যতাই প্রাপ্যের একমাত্র চিরকালীন নির্ণয়ক ! অযোগ্যকে অবাধ স্বাধীনতা দিলে, দাতা ও গ্রহীতা, - উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় - স্বাধীনতার স্বেচ্ছাচারিতায় অবধারিত অনুবাদে ৷
.
এবার আবার ফেরা যাক মানবজীবনে অনুভব ও যুক্তির আপন আপন কার্যকারিতার অনুধাবনে !
.
সত্যকে স্পর্শের স্বাধীন অধিকার অনুভবের (Perception) !
.
প্রসঙ্গতঃ, অনুভবের সাথে অন্ধ-বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ কোন রকম সম্পর্ক নেই ! অন্ধবিশ্বাসের বাস মানুষের মস্তিষ্কে, অলীক কল্পনার প্রতি একবগগা আসক্তিতে !
অপরপক্ষে, অনুভবের আধার পরাণ তথা মানবহৃদয়, যার সাথে বিবেকের তথা মানবিকতার সরাসরি যোগ ! অন্ধ-বিশ্বাস তাই এক্ষেত্রে প্রসঙ্গ-বহির্ভূত ৷
.
যুক্তির কাজ - অনুভব-আবিষ্কৃত সত্যের গ্রহণযোগ্যতাটি তৈরী করে দেওয়া সফলতম অনুবাদে ৷ সে অনুভবের কর্মচারী মাত্র !
.
এবারে, অনুভবের মালিকানা হরণ করে, কমিউনিজমের বঞ্চিত-দরদী আদর্শকে মাথায় রেখে, এই কর্মচারীটিকে - মানবজীবনের যাবতীয় সিদ্ধান্তের স্বাধীন অধিকার দিলে, দেখা যাক - ব্যপারটা ঠিক কেমন দাঁড়ায় !
.
যুক্তির উৎসরূপে বুদ্ধি যেই মালিকানাটি পাবে, তার যেহেতু বিবেকের মত one way ticket to truth - এর নিয়ন্ত্রণটি নেই, সুতরাং, সত্য ও মিথ্যা দুদিকেই অবাধ বিচরণক্ষমতার কারণে, সুযুক্তিকে কুযুক্তির দ্বারা প্রতিস্থাপনের বল্গাহীন অধিকারে,
অবদমিত বাসনারা সুযোগসন্ধানী হওয়ার প্রকৃষ্টতম সুযোগ পাবে !
.
এই সুযোগে অহঙ্কার তার বহু আকাঙ্খিত - নিজেকে 'পৃথিবীতে একমাত্র সঠিক ও শ্রেষ্ঠ' প্রমাণ করার জন্য আপ্রাণ ঝাঁপিয়ে পড়বে !
.
কর্তৃত্ব ও প্রভূত্ব-বাসনারা চালাকির সুসহযোগে প্রতিদ্বন্দ্বীকে অকাট্য যুক্তির দ্বারা, নিকৃষ্টতম প্রমাণ করে, তাকে হয় বিনাশ, না হলে, বশীভূত করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করবে !
অর্থলোভীরা, কুযুক্তির সার্থক প্রয়োগে, নির্ধনের অবশিষ্ট ধন আত্মস্মাৎ করে প্রভূত ধনের অধিকারী হবে !
সীমিত সংখ্যক শোষকের কুযুক্তির, বলপ্রয়োগের অধিকারে, কোটি কোটি শোষিত, নিপীড়িত, বঞ্চিতের, দিকে দিকে, করুণ হাহাকার রবে ধরার হৃদয় বিদীর্ণ হবে ৷
যুক্তির উপরে অনুভবের প্রাপ্য নিয়ন্ত্রণকে, বাগে পেয়ে, অপরিমিত নির্মম ধর্ষণই, প্রকারান্তরে উৎসরূপে, মানবিকতাকে দিকে দিকে নিরন্তর ধর্ষণের প্রতিভূ হয়ে, আজকের পৃথিবীতে, মানুষের পাখির স্বাধীনতায় স্বতঃস্ফূর্ত উড়ানের বিরুদ্ধে যে একমাত্র স্বৈরাচারী প্রতিবন্ধক রূপে বিরাজ করছে, - এই নির্মম সত্যটিকে - যুক্তিবাদ, তবু, অন্ধ উল্লাসে অস্বীকার করেই যাবে ৷
অবশেষে মানুষের হুঁশ একদিন ফিরতেও হয়তো হবে, তবে তার অনেক আগেই, সুযোগসন্ধানী কুযুক্তিদের - প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষকে ধ্বংসের প্রদত্ত অধিকার, পৃথিবী নামক গ্রহটির সর্ববিধ মৃত্যু যে ডেকে আনতে যথেষ্টই সক্ষম, - এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ বড় একটা নেই ৷
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন